১
অধ্যায় ১
ভূমিকা: তওবা ও গোলামির চুক্তি
- মজলিসের শুরুতেই সবাই মিলে মহান পরিচালকের কাছে তওবা — তিনি যেন আমাদের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন।
- আমরা আল্লাহর সাথে গোলামির চুক্তি করেছি — যে ওনার মত করে চলব। এত বড় শক্তিশালী সত্তা, পরিচালক তিনি; চুক্তি করেও আমরা উল্টো চলছি, অনেক ভুল করছি।
- এর মূল কারণ: সেই রবের একিন — তিনিই যে একমাত্র ইলাহ — সেই একিন আমাদের ভিতরে আসেনি।
২
অধ্যায় ২
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ: মানুষের সব সমস্যার সমাধান
ইলাহ শব্দের প্রকৃত অর্থ
"ইলাহ" মানে শুধু যাকে পূজা করা হয় — এতটুকুই নয়। আরবিতে এর গভীর অর্থ রয়েছে:
- যাকে ভয় করা হয়
- যার কথামত মানুষ চলে
- যার থেকে উপকার আশা করে
- যার ক্ষতির ভয় করে
- যার ভয়ে মানুষ কাঁপে
— সবকিছু মিলিয়ে ইলাহ।
আজকের মানুষ ১০০, ২০০, ১০০০ ইলাহ নিয়ে চলে
যাকে ক্ষমতার উৎস মনে করা হবে, সেটাই ইলাহ হয়ে যাবে:
| যাকে মাথা নত করা হয় | তার ইলাহ |
| যে টাকার কাছে মাথা নত করে | টাকা |
| যে বসের চিন্তায় ঘুমাতে পারে না | বস |
| যে Facebook-এর লাইক-কমেন্টের জন্য জীবন সাজায় | পাবলিক |
| যে নিজের চেহারা-খ্যাতির পিছনে ছোটে | সে নিজেই নিজের ইলাহ |
| যে রাজদণ্ডের ভয়ে কাঁপে | ক্ষমতা |
"আফারাআইতা মানিত্তাখাযা ইলাহাহু হাওয়াহ" — আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে নিজের মনকেই মাবুদ বানিয়ে ফেলেছে?সূরা ফুরকান ৪৩ / জাসিয়া ২৩
তাহলে শুধু মূর্তিপূজাই মুশরিকি নয়
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" মানে শুধু "আমি আল্লাহকে মানি" — এতটুকু নয়। এর অর্থ:
আমি শুধুমাত্রই আল্লাহকে মানি — বাকি সমস্ত ইলাহ আমি আমার দিল থেকে নামিয়ে দিয়েছি।
৩
অধ্যায় ৩
প্রথম বিষয়: আল্লাহর উলুহিয়াতের একিন
কোনো জিনিসের নিজস্ব ক্ষমতা নেই
- মানুষ মনে করে টাকা থাকলেই সব হয়ে যাবে। কিন্তু টাকা কি মানুষকে সুখ বেশি দেয়, নাকি বিপদ ও কষ্ট বেশি দেয়?
- যুবকেরা কত আশা করে — সুন্দরী স্ত্রীই সুখের কারণ হবে। কিন্তু একটা মেয়ে তো মানুষের বিপদ বা কষ্টেরও কারণ হতে পারে।
- এখানে কোনো জিনিসেরই কোনো ক্ষমতা নেই। সবকিছুকে সৃষ্টি করা হয়েছে — সব মেশিন। সেই মালিকের মেশিন আমরা সবাই। এই যে আমার শরীর — এটার পরিচালক আরেকজন, তিনি আল্লাহ।
"রব" মানে পরিচালক
বক্তার নিজের ভাষায়: "আমি রবের অর্থ পরিচালক বলি। প্রতিপালক বললে মনে করে ঘরের মধ্যে পালব — এতটুকু। পরিচালক, যিনি মমতার সাথে পরিচালনা করেন — বস, ডিরেক্টর যাকে বলা হয়।"
অন্তর একমুখী না হলে শান্তি নেই
- আপনার ইলাহ কয়জন? কয়টা জিনিস থেকে উপকার আশা করেন? কয়টা জিনিসকে ভয় করেন?
- অন্তর একটা। অন্তর যদি বহুদিকে ধাবিত হয়, শান্তি পাবেন না।
- ১০০ জিনিসকে ভয় পেলে কোনদিকে নিজেকে সেভ করবেন? একটা বন্ধ করবেন, আরেকটা চালু হবে।
- ১০০ জায়গা থেকে আশা করলে কোন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করবেন?
- যদি বিশ্বাস আসে যে সেন্ট্রাল এক জায়গা থেকেই সব আসে — অন্তর একদম প্রশান্ত হয়ে যাবে।
"ইন্নামা আশকু বাসসি ওয়া হুযনি ইলাল্লাহ" — আমি আমার যা পেরেশানি, একজনকেই বলব। যা চাওয়ার একজনের কাছেই চাইব।সূরা ইউসুফ ৮৬
"আল্লাহুম্মা লা মানিআ লিমা আ'তাইতা…" — আল্লাহ তা'আলা বাধা দিলে কেউ দিতে পারবে না, আল্লাহ তা'আলা দিতে চাইলে কেউ বাধা দিতে পারবে না।
আমার শরীরেও আমার ক্ষমতা ১% নেই
- শরীরের ভিতরে পরিবর্তন, রোগ-ব্যাধি, চেহারা — কিছুই আমার ইচ্ছায় হচ্ছে না। হার্ট, কিডনি — সব তিনিই চালাচ্ছেন।
- বীজ মাটিতে রেখে আমি ঘুমিয়ে পড়ি — "ইন্নাল্লাহা ফালিকুল হাব্বি ওয়ান নাওয়া" (সূরা আন'আম ৯৫) — সেই বীজ থেকে চারা ও ফসল আল্লাহই বের করেন।
- খাবার মুখে দেওয়ার পর হজম তো সেই মালিকই করেন — ভিতরে কী হচ্ছে আমি কিছুই জানি না।
"ওয়া মা তাশাউনা ইল্লা আঁইয়্যাশাআল্লাহু রব্বুল আলামিন" — তোমরা ইচ্ছাও করতে পারবে না, যদি আল্লাহ তা'আলা আগে ইচ্ছা না করেন।সূরা তাকভীর ২৯
৪
অধ্যায় ৪
তাওহীদের প্রমাণ: সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টাকে দেখা
বক্তা জানান, তিনি তাওহীদের ১২টি দলিল নিয়ে "তাওহীদের প্রমাণ" নামে একটি বই লিখেছেন। লাইভে গভীর আলোচনায় না গিয়ে সহজ ভাষায় প্রমাণগুলো তুলে ধরেছেন।
এক নম্বর প্রমাণ — দুর্বল বস্তুর অসাধ্য কাজ, বুদ্ধিহীন জিনিসের বুদ্ধির কাজ
গাছ — একটি চলমান ফ্যাক্টরি
- আমার চাইতে বুদ্ধিহীন একটা গাছ কত সুন্দর পাতা, ফল, ফুল তৈরি করছে। তার মধ্যে শৈল্পিক ডিজাইন কোত্থেকে আসলো?
- সে বাতাস, পানি, মাটি ও সূর্য — চারটি সোর্স থেকে খাবার নেয়। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি খাবার লাগে গাছের, আর আল্লাহ তাকে বসে বসে খাওয়ান।
বীজ ও পানির ফোঁটা
- একটা বীজ নিজে দাঁড়াতেই পারে না — ১-২ mg থেকে ২০০০ টনের গাছ হয়ে যায়।
- এক ফোঁটা পানির কতটুকু শক্তি? তা থেকে বিশাল মানুষ হয়ে যায়। তার মানে এই পানি মানুষ হয়নি — নিশ্চয় এখানে কেউ কারিগর হয়েছেন।
- উপমা: কেউ যদি বলে "আমার প্রতিষ্ঠান একটা ছোট্ট বালুকণা থেকে বড় হতে হতে হয়ে গেছে" — বিশ্বাস করবেন? বলবেন, এই বালু করেনি, নিশ্চয় অন্য কেউ করেছে। তিনিই আল্লাহ।
লাউয়ের ভিতরের পানি
মেশিন দিয়ে ঠেলেও লাউয়ে ওই পরিমাণ পানি ভরা যাবে না। তাহলে লাউয়ের মধ্যে এত সুন্দর ডিজাইন আর পানি কে ভরে দিলেন?
কলমের উপমা
একটা কলম নিজে সুন্দর উপন্যাস লিখে ফেলেছে — কেউ মানবে না। কলমের বুদ্ধি নেই, ক্ষমতা নেই। নিশ্চয় কলমের উপরে কারো হাত ছিল।
সদ্যজাত প্রাণীর জ্ঞান
- ডিম থেকে ফুটে হাঁস বেরিয়ে সরাসরি পানিতে নেমে পড়ে — সে কোনোদিন পানি দেখেনি।
- জন্মের পরই বিড়াল দেখে দৌড় দেয় — সে কোনোদিন বিড়াল দেখেনি। নিশ্চয় তার ভিতরে কেউ জ্ঞান দিয়ে পাঠিয়েছে।
জড় বস্তুতে জান
- অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন — এগুলো ল্যাবে মিক্স করলে একটা পচা কাদামাটি হবে, আর কিছু না। এখানে জান দেওয়া যাবে না।
- অথচ এই জড় বস্তুর মধ্যেই তিনি জান দিয়ে দেন। এটা কীভাবে আসে, বিজ্ঞান আজও প্রমাণ করতে পারেনি।
সবকিছু একই উপাদানে
আল্লাহ সবকিছু এক ধরনের জিনিস থেকে বানিয়েছেন — অণু-পরমাণু সব একই। যে জিনিস দিয়ে আমি তৈরি, সেই জিনিস দিয়েই গাছ ও মাটি তৈরি। শুধু ভিন্ন ভিন্ন সুরত দিয়েছেন।
প্রাসঙ্গিক নিদর্শন
পৃথিবীতে মাত্র তিনটি প্রাণী রিজিক জমা করে — ইঁদুর, পিঁপড়া ও মানুষ। বাকি সব প্রাণী প্রতিদিন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে: আল্লাহ কালকে খাইয়েছেন, আজকেও খাওয়াবেন।
৫
অধ্যায় ৫
আল্লাহর ক্ষমতা: কেন আমাদের ভয় আসে না?
এমপির উপমা
একজন লোককে চিনলেন না। কেউ বলল, "উনি এলাকার এমপি সাহেব" — শোনামাত্র ভয় চলে আসে। শুনলেন উনি গুলি নিয়ে ঘোরেন — আরও ভয়। শুনলেন গতকাল একটা মার্ডার করেছেন — তখন তো ভয়ের সীমা থাকে না।
তাহলে আল্লাহর ক্ষেত্রে কেন একিন আসে না? তিনি কি আসমান-জমিন বানাননি? যাঁর কাছে আসমান আছে, বজ্রপাত আছে, মাটি আছে, ভূমিকম্প আছে — কেন ভয় আসে না?
এটা বারবার বলতে হবে। ঈমান আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে — এটা দুনিয়াবি বিষয়ের মত নয় যে একবার শুনলেই ভয় ঢুকে যাবে।
অতীত জাতির পরিণতি
- আল্লাহ এক-দুইজনকে নয়, পুরো জাতিকে ধ্বংস করেছেন — যারা গোলামির চুক্তি মানেনি, অথবা চুক্তিই করেনি।
- পৃথিবীর সমস্ত নবীর জাতির সাথে আল্লাহ যোগাযোগ করেছেন। প্রত্যেক সমাজের সর্বোত্তম মানুষটিকে ফেরেশতার মাধ্যমে নবী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন।
"ইন্নানী আনাল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা আনা ফা'বুদনী" — আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমারই ইবাদত করো।সূরা ত্বহা ১৪
গোলামির অফারের শর্ত
- তুমি নিজেও আমার গোলাম, সবাইকে আমার সাথে গোলামির চুক্তি করাও
- যারা মানবে — দুনিয়াতে রিজিক, মৃত্যুর পরে জান্নাত
- যারা মানবে না — দুনিয়াতেই মেয়াদ শেষে আজাব, মৃত্যুর পরে চির জাহান্নাম
"ওয়াল আসর, ইন্নাল ইনসানা লাফী খুসর" — ইতিহাসের কসম, যুগে যুগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্তই বেশি হয়েছে।সূরা আসর
কিছু লোক গোলামির চুক্তি করেছে; নবীরা তাদের নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন — আর নবীরা চলে যাওয়া মাত্রই আজাব এসে পুরো জাতি ধ্বংস।
একটি প্রশ্ন ও তার জবাব
বক্তা AI-কে প্রশ্ন করেছিলেন — আল্লাহ কি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের সাথে যোগাযোগ করেছেন? সব নবী তো ওখানেই দেখি।
জবাব: না, সবার সাথেই যোগাযোগ করেছেন। ইন্ডিয়াও তো আদম আলাইহিস সালামের দেশ, হাবিল-কাবিলের দেশ; নূহ আলাইহিস সালামের সূচনাও এখান থেকে। প্রত্যেক সমাজের বেস্ট মানুষটিকে নির্বাচিত করে ফেরেশতা পাঠিয়ে সবাইকে গোলামির অফার করেছেন।
আমরা তো চুক্তি করেও মানছি না — আমাদের কী পরিণতি হবে? সেই পরিচালকের সাথে পাঙ্গা নিয়ে পারবেন?
৬
অধ্যায় ৬
মালিকানা কার? সব কিছু আল্লাহর
"লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ" — আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সব শুধুমাত্র আল্লাহর।
- কোরআনে আল্লাহ বারবার এই দাবি করছেন। এখানে আমাদের কোনো কিছুর মালিকানা নেই।
- তাহলে আমার কীভাবে মনে হয় — এই বাড়ি আমার, গাড়ি আমার, টাকা আমার? আমি তো আমার নিজেরই মালিকানা পাইনি, আমারই তো গ্যারান্টি নেই।
"আগে আপনে মউত সে কোই খবর নেহি, সামান ১০০ সাল কি হ্যায়, কাল কি পতা নেহি" — মানুষ দুনিয়াতে এমন আয়োজন করে যেন ১০০ বছর বাঁচবে, অথচ কালকে বাঁচবে তারও গ্যারান্টি নেই।
কোরআনে বারবার: "আমি বৃষ্টি নাযিল করি, আমি ফসল তৈরি করি", "মানুষের হায়াত-মউত আমিই দিই।" — তাহলে সব পরিচালনা তো ওনারই হচ্ছে।
স্বার্থ কার কাছে?
মানুষ যার থেকে উপকার পায়, তার পিছনে দৌড়ায়। তাহলে সব স্বার্থ কার কাছে? — আল্লাহর কাছে। কারণ ক্ষমতা ওনার কাছে, সম্পদ ওনার কাছে।
একিনের সারকথা: আমি শুধু আশা করব এক আল্লাহ থেকেই, ভয় করব এক আল্লাহকেই, মানব এক আল্লাহকেই। কেউ আমাকে কিছু দিতে পারবে না, কেউ আমার থেকে কিছু নিতে পারবে না।
৭
অধ্যায় ৭
ঈমানি ছড়া: বাচ্চাদের জন্য তাওহীদের পাঠ
বক্তা শিশুদের জন্য ১০০০ লাইনের ঈমানি ছড়া লিখেছেন। প্রতি সপ্তাহে ঈমানি মজলিসে কেউ না কেউ এই ছড়া গাইবেন — এই নিয়ম চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন।
সহজ ভার্সন
আকাশ, জমিন, সাগর, পাহাড় — বলো তুমি কার?
কারো নয়, কারো নয়, শুধু আল্লাহর।
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা — বলো তুমি কার?
কারো নয়, কারো নয়, শুধু আল্লাহর।
(যেকোনো মাখলুকের নাম বসিয়ে বলা যাবে — "বলো তুমি কার?")
আল্লাহর নামসহ পূর্ণ ভার্সন
আকাশ, জমিন, সাগর, পাহাড় — সৃষ্টি বলো কার?
কারো নয়, কারো নয়, হাকিম আল্লাহর।
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা — হুকুম মানে কার?
কারো নয়, কারো নয়, হাকিম আল্লাহর।
মাটির ভূমি, পানির সাগর — পরিচালনা কার?
কারো নয়, কারো নয়, মালিক আল্লাহর।
গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালি — জিকির করে কার?
কারো নয়, কারো নয়, আজিজ আল্লাহর।
ফলে, ফুলে, বিশাল বাগান — নিয়ামত বলো কার?
কারো নয়, কারো নয়, রহমান আল্লাহর।
পিতা, মাতা, ভাই, বোন — করুণা বলো কার?
কারো নয়, কারো নয়, রহিম আল্লাহর।
এই দুনিয়ার সবকিছু আল্লাহ তা'আলার,
আমরা সবাই মেহমান, করছি ব্যবহার।
করলে খুশি আল্লাহকে, দিবেন নতুন জীবন,
সবকিছুই নিজের হবে, হবেন খোদা আপন।
কেন এই ছড়া
- "লিল্লাহি মা ফিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ" — এই আয়াতের আমল হবে ছড়ার মাধ্যমে।
- আজকের ওয়ার্ড-বুকে শিশুরা শিখছে "এটা বাতাস, এটা ছাগল, এটা গরু" — কিন্তু এগুলো যে মাখলুক, আল্লাহ বানিয়েছেন — এই ঈমানি দৃষ্টিকোণ থেকে শিখছে না।
- আমাদের দৃষ্টি এটাই হবে: যা দেখছি, সব আল্লাহর মাখলুক, সব মেশিন। এই সূর্য আল্লাহর মেশিন, গাছ মালিকের মেশিন — তার নিজের ক্ষমতা নেই।
৮
অধ্যায় ৮
হাকিকি ঈমান বনাম আন্দাজি ঈমান
মালামালের উপমা
একটা শহরে বিশাল পরিমাণ মালামাল এসেছে। সবাই প্রশ্ন করছে — এগুলো কার?
- আন্দাজি ঈমান: "এই ব্যক্তি অনেক ধনী, তার হতে পারে" — অনুমান।
- হাকিকি ঈমান: আমি মালগুলো দেখি — ওখানে ওনার নাম লেখা আছে কিনা? ব্র্যান্ডের নাম, সিগনেচার, সিলমোহর মারা আছে কিনা? সবকিছু দেখে নিশ্চিত করা।
আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে ওনার অস্তিত্বের প্রমাণ, ওনার সিগনেচার, ওনার রুবুবিয়াতের চিহ্ন, ওনার কুদরতের প্রকাশ — এগুলো যখন দেখবেন, তখনই সেই মালিককে চিনতে পারবেন।
ঈমান হাসিলের তিনটি পদ্ধতি
১. তাফাক্কুর ফি খালকিল্লাহ
আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে বেশি বেশি গবেষণা করা, সৃষ্টির মধ্যে মালিককে দেখা। প্রত্যেকটা জিনিসই মেশিন; মেশিন দেখলে যে বানিয়েছে তার কথা মনে আসে।
২. জিকির
বেশি বেশি আল্লাহর জিকির, ঈমানি জিকির, কালেমার জিকির, তাসবিহ।
৩. তাআল্লুক মাআল্লাহ / সহবত
ঈমানদার বান্দাদের সাথে থাকা। মানুষ বই-কলম থেকে যত না শেখে, সহবত থেকে তার চেয়ে বেশি শেখে।
সবকিছুই আল্লাহর আয়াত
এই পদ্ধতিতে আল্লাহকে আপনি আশেপাশে দেখতে পারবেন — গাছের মধ্যে, সমুদ্রের মধ্যে, আসমানের মধ্যে। সবকিছুকে আল্লাহর আয়াত মনে হবে।
ব্যক্তিগত উপমা: বক্তার ছোট ভাই ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর বাবা যখন ভাইয়ের পোশাক দেখতেন, কাঁদতেন — "হায় তাহসিন, হায় তাহসিন।" ওই পোশাকগুলো ছিল ছোট ভাইয়ের আয়াত, আলামত। তেমনি সবকিছু দেখে তো আল্লাহকেই স্মরণ হওয়ার কথা — কারণ তিনিই সেগুলো চালাচ্ছেন, এগুলো ওনারই মেশিন।
দুটি অর্জন
এই ঈমানি প্রশিক্ষণ থেকে যা শিখবেন:
- আল্লাহর প্রশংসা করতে পারা — যদি এই জবান দিয়ে সেই রবের প্রশংসাই না করতে পারেন, তাহলে কী করলেন?
- আন্দাজি ঈমান নয়, হাকিকি ঈমান ভিতরে আসা।
৯
অধ্যায় ৯
দ্বিতীয় বিষয়: সব চাওয়া মালিকের কাছে পেশ করা
"ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন" — গোলাম কার কাছে চাইবে? সে তো তার মালিকের কাছেই চাইবে।সূরা ফাতিহা ৫
চাওয়ার নিয়ম — নামাজ
- বেশি বেশি নফল নামাজ। ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নতে মুয়াক্কাদা দিয়ে শাস্তি থেকে বাঁচো; খোদার কাছ থেকে পেতে চাও — নফল পড়ে যাও।
- নবী ও সাহাবায়ে কেরাম যেকোনো প্রয়োজনে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন, মোনাজাতে আল্লাহর কাছে পেশ করতেন। বৃদ্ধ বয়সে সন্তান হয় না — মোনাজাতে চেয়েছেন, আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন।
- যেকোনো সমস্যায় নামাজের পরে ১৫ মিনিট বা আধা ঘণ্টা — যতক্ষণ লাগে — মোনাজাতে আল্লাহর কাছে পেশ করুন। আল্লাহর সামনে আল্লাহর প্রশংসা করুন।
মারইয়াম আলাইহাস সালামের ঘটনা
জাকারিয়া আলাইহিস সালাম ঘরে তালা মেরে দাওয়াতে চলে গিয়েছিলেন। দুই-তিন দিন পর দৌড়ে এসে ভাবছেন — ভাতিজি না খেয়ে মারা গেছে নিশ্চয়। এসে খুলে দেখেন সামনে দস্তরখানা ভরা, বেমৌসুমি ফল যা এই এলাকায় পাওয়াই যায় না — থালা-ঝুড়ি ভরে রয়েছে।
"ইয়া মারইয়ামু আন্না লাকি হাযা?" — এত সুন্দর খাবার কোত্থেকে এলো?
"কালাত হুয়া মিন ইনদিল্লাহ" — এগুলো আল্লাহ পাঠিয়েছেন।সূরা আলে ইমরান ৩৭
শিক্ষা: যেকোনো সমস্যায় তাঁরা ভয় পাননি — কারণ উপকার-ক্ষতি তো ওনার থেকেই আসে।
গুলির উপমা — মাখলুককে কেন ভয় পাব?
- টেবিলে পড়ে থাকা গুলিকে আপনি ভয় পান না। কিন্তু গুলি যদি কারো কন্ট্রোলে থাকে, তখন ভয় পাওয়া শুরু করেন।
- তাহলে ভয় পেতে হবে সেই মালিককে, যাঁর কন্ট্রোলে সব মেশিন — মেশিনকে নয়।
এখলাস = অন্তর একমুখী হওয়া
- এককেন্দ্রিক হওয়া, মুখলিস হওয়া, একদিকে একমুখী হওয়া।
- বক্তার নিজের স্বীকারোক্তি: "আমার অন্তরও তো অনেকটা বহুমুখী, একমুখী হওয়ার চেষ্টা করছে।"
- যা করব ডিউটি হিসেবে করব — আর সুখ-শান্তি মালিকের কাছ থেকেই আশা করব।
সবর ও নামাজ
"ওয়াসতাঈনু বিস সাবরি ওয়াস সালাহ" — সবর ও নামাজ দিয়ে আমার কাছে সাহায্য চাও।সূরা বাকারা ৪৫
এখানে সবর মানে অন্তরের স্থিরতা — অর্থাৎ ঈমান। যার ভিতরে আল্লাহ থেকে হওয়ার একিন আছে, সেই ধৈর্য ধরতে পারবে; তার অন্তরে স্থিরতা এসে যাবে। সে দুনিয়ার কোনো জিনিস দেখে ভয় পাবে না, কোনো জিনিসের আশায় অস্থির হবে না।
১০
অধ্যায় ১০ · সবক ১
পাঁচ কারণে গোলাম মালিক বদলালো
এটি আজকের মজলিসের প্রথম পড়া। বক্তা বলেছেন, এই একটি বিষয়ের উপরেই দুই ঘণ্টার ওয়াজ করা যায় — কারণ আল্লাহর বড়ত্ব এখানেই চলে আসে।
ঘটনা: এক গোলাম মালিকের গোলামি ছেড়ে চলে গেল। মালিক এসে দেখে গোলাম নেই — দৌড়ে গেল গোলামের বাড়িতে। "আমার কাছে কী কমতি ছিল, যে তুমি চলে গেলে?"
গোলাম বলল: "আমি নতুন মালিক খুঁজে পেয়েছি — পাঁচটা কারণে, পাঁচটা সুবিধা বেশি পেয়েছি।"
| # | পুরনো মালিক | নতুন মালিক (আল্লাহ) |
| ১ | আপনি খেতেন, আমরা দাঁড়িয়ে থাকতাম | তিনি খান না, আমাদের খাওয়ান |
| ২ | আপনি ঘুমাতেন, আমরা দাঁড়িয়ে পাহারা দিতাম | তিনি ঘুমান না; আমরা ঘুমাই, তিনি আমাদের পাহারা দেন |
| ৩ | গোলামি খুব কঠিন — দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, অনেক পরিশ্রম | গোলামি অনেক সহজ — বসেও করা যায়, শুয়েও করা যায়, দাঁড়িয়েও করা যায় |
| ৪ | ভয় — কখন রাগবেন, কখন কী শাস্তি দেন, ভুল হয়ে যায় কিনা; মাফ পাব কি পাব না সন্দেহ | তিনি রহিম — লজ্জিত হয়ে বলতেই দেরি, মাফ করতে দেরি নেই |
| ৫ | আপনি মারা গেলে কী হবে? আপনার উত্তরাধিকারীকে ধমকালে, আপনার শত্রুদের চক্ষুশূল হলে বিপদ | তিনি চিরস্থায়ী, মারা যাবেন না; আমাকেও চিরস্থায়ী করবেন |
পঞ্চম কারণের বিস্তার
- তিনি মৃত্যুর পরে আমার জন্য আরেকটা জীবন সাজিয়ে রেখেছেন — চিরস্থায়ী বাদশাহি দেবেন।
- কয়েকদিন গোলামি করলেই তিনি বন্ধু বানিয়ে ফেলবেন — তখন ইচ্ছা করেও গোলামি করতে পারব না।
- আমাকে বাদশাহি দেবেন, আমার অধীনে শত কোটি গোলাম বানিয়ে দেবেন।
- "আমি ১০০ বছর গোলামি করলেও তো আপনি আমাকে বন্ধু বানাবেন না, মেহমান বানাবেন না।"
১১
অধ্যায় ১১
তওবার গজল: "পাপ করেছি খোদা"
গোলামের গল্পের চতুর্থ কারণ (মাফের প্রসঙ্গ) থেকে বক্তা এই গজলটি শোনান।
🎵 পাপ করেছি খোদা
গোলাম আমি এক মালিকের, কত যে মহান বলি,
মনের গোলামি করে যখন পাপের পথে চলি।
লজ্জা মনে কেঁদে বলি — পাপ করেছি খোদা,
বলেন: বান্দা, তোকে মাফ করেছি।
কর্মচারী মহারাজে, মুখে শুধু বলি,
চুক্তি করে তবু কেন ইচ্ছেমত চলি।
লজ্জা মনে কেঁদে বলি — পাপ করেছি,
মহান রবের ওয়াদা: তোকে মাফ করেছি।
যিনি দিলেন সবকিছু, তাকেই দিয়ে কথা,
হারাম মজা শেষে নিয়ে ঈমানি ব্যথা।
মোনাজাতে দুহাত তুলে — পাপ করেছি খোদা,
বলেন: বান্দা আমার, মাফ করেছি।
ভেবেছিলাম দরজা বন্ধ, দেখেনি কোনো লোক,
ভুলে গেছি দেয়াল-ছাদের ওপারে এক চোখ।
চোখ নামিয়ে কান্না সুরে — পাপ করেছি খোদা,
বলেন: বান্দা আমার, মাফ করেছি।
গোপন গুনাহ শেষে আফসোস এরই পলক,
আকাশ থেকে দেখেছে হায় আমার পরিচালক।
লজ্জা মনে কেঁদে বলি — পাপ করেছি খোদা,
বলেন: বান্দা, তোকে মাফ করেছি।
ডাকলে উনি না যাই যদি মসজিদেরই পানে,
মত্ত থাকি অযথা কাজে শয়তানেরই গানে।
কাযা পড়ে তওবা করি — পাপ করেছি খোদা,
বলেন: রহিম আমি, মাফ করেছি।
পাপের পাহাড় যত উঁচু, ক্ষমা তার চেয়ে বেশি।
না, হতাশ ফিরে এসো — বলি তোমায় ভালোবাসি।
লজ্জা মনে কেঁদে বলি — পাপ করেছি,
ওয়াদা খোদার: বান্দা, তোকে মাফ করেছি।
সম্মিলিত তওবার আহ্বান
"হে মালিক, হে পরিচালক — আপনার কাছেই তো আমাদের প্রত্যাবর্তন। আপনার কাছে ফিরে যেতে হবে, তখন কারো সম্পর্ক থাকবে না — না বন্ধু, না পিতা-মাতা, সব সম্পর্ক কাটা। ওইদিন বন্ধু শত্রু হয়ে যাবে। তখন আপনার সম্পর্কই কাজে লাগবে। এখন থেকে আপনার মত করে চলব — আমার মত তো অনেক চলেছি। যে নৌকা আমি বইতে পারব না, সেটা কেন বইতে যাব? সেই মালিকের উপরেই ছেড়ে দিই, যিনি সবকিছুর ক্ষমতার অধিকারী।"
১২
অধ্যায় ১২ · সবক ২
জান্নাতের দরজায় পাঁচ প্রশ্ন ও পাঁচ ঘোষণা
এটি আজকের মজলিসের দ্বিতীয় পড়া। বক্তা বলেছেন — আরবি বলতে হবে না, বাংলাতেই ভালো করে শিখে নিন।
জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে বান্দা বলবে: "আল্লাহ, সারাটা জীবন আপনার মত করে চললাম, মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চললাম, দুনিয়াতে সম্পদ কামাইনি — যা ছিল আপনার রাস্তায় দিয়ে দিয়েছি। অন্যরা মৌজ-মস্তি করেছে, আমি করিনি। আমার জন্য এখানে কী আছে?"
| প্রশ্ন | ঘোষণা |
| ১. এখানে আমার জন্য কী আছে? | "আন তানআমু ফালা তাব'আসু আবাদা" — চিরস্থায়ী নিয়ামত ও বাদশাহি সাজানো আছে, যা কোনোদিন শেষ হবে না |
| ২. যদি মারা যাই, তাহলে এত নিয়ামত পেয়ে কী লাভ? | "আন তাহইয়্যু ফালা তামুতু আবাদা" — চিরস্থায়ী জীবন তোমার জন্য মোবারক হোক |
| ৩. যদি এখানে বুড়ো হয়ে যাই, বার্ধক্য আসে? | "আন তাশিব্বু ফালা তাহরামু আবাদা" — চিরস্থায়ী যৌবন মোবারক হোক; একদম টাটকা জোয়ান থাকবে |
| ৪. যৌবনে যদি অসুস্থ হয়ে যাই? | "আন তাসিহ্হু ফালা তাসকামু আবাদা" — চিরস্থায়ী সুস্থতা, সতেজতা, সজীবতা ও ফুর্তি মোবারক হোক |
| ৫. কোনো সময় যদি মন খারাপ হয়, বিরক্তি আসে? | এখানে কোনো বিরক্তি, কষ্ট, রোগ-ব্যাধি কিছুই আসবে না |
সংশ্লিষ্ট আলোচনা
মৃত্যুর মৃত্যু
মৃত্যুকে তো হাশরের ময়দানেই জবাই করে দেওয়া হয়েছে। এখানে যারা আছে, সবাই চিরস্থায়ী।
"ফারীকুন ফিল জান্নাতি ওয়া ফারীকুন ফিস সাঈর" — কিছু লোক জান্নাতে, কিছু লোক জাহান্নামে — আবাদান আবাদা।সূরা শূরা ৭
জান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থান
- জাহান্নাম — এই মাটির নিচে, এই দুনিয়ার নিচে।
- জান্নাত — আরশের নিচে। সাত আসমানের উপরে বিশাল সমুদ্র, শুধু পানি আর পানি; সেই পানির উপরে জান্নাত, তার উপরে আল্লাহর আরশ — "ওয়া কানা আরশুহু আলাল মা" (সূরা হুদ ৭)।
মৃত্যুর পর মাত্র দুটি পরিচয়
এখানে আমাদের পরিচয় — কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক। কিন্তু মৃত্যুর পর আমাদের দুটি পরিচয় থাকবে: হয় জান্নাতের বিশাল বাদশাহ, নয়তো জাহান্নামের জেলখানার কয়েদি।
যুগভেদে জান্নাতের বর্ণনা
- আরবদের কাছে বোঝানোর জন্য বলা হতো — এমন বাগান যার পাদদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত। তাদের কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় নিয়ামত; সুন্দর উটও আকর্ষণীয় ছিল।
- আমাদের জামানায় হলে বলা হতো — হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট থাকবে, ল্যাম্বরগিনি-বিএমডব্লিউ থাকবে।
- বাস্তবে জান্নাতে গেলেই বুঝতে পারব সেখানে কী আয়োজন করা আছে। সেই রবের সাথে সম্পর্ক হয়ে গেলে — মজা দেওয়ার মালিক তিনি, শান্তি দেওয়ার মালিক তিনি।
চিরস্থায়িত্বের চিন্তা
"আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম" — আল্লাহ নিজেও চিরস্থায়ী, আর আমাকে-আপনাকে বানিয়েছেন চিরস্থায়ী জিন্দেগির জন্য।
এই চন্দ্র-সূর্য ধ্বংস হয়ে যাবে — আমি, আপনি চিরস্থায়ী। আগের মানুষ কবিতা লিখত: "হায়, আমি মারা যাব, চন্দ্র-সূর্য থেকে যাবে।" নবীরা এসে বোঝালেন — তোমরা চিরস্থায়ী, এগুলো ক্ষণস্থায়ী।
১৩
অধ্যায় ১৩
দুনিয়ার হাকিকত: এই জীবন ধোঁকা
"ওয়ামাল হায়াতুদ দুনইয়া ইল্লা মাতাউল গুরুর" — দুনিয়ার জীবন ধোঁকার জিন্দেগি ছাড়া কিছু নয়।সূরা আলে ইমরান ১৮৫
এই জীবন পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতা
মৃত্যুর পরের জীবনই আসল জীবন। যে জীবন মৃত্যুতে পরিণত হয়ে যায়, যে জীবনে সবকিছু হারিয়ে যায় — সেটাকে জীবন বলা চলে না। একটা জিনিস যদি কালকেই নষ্ট হয়ে যায়, তার ভ্যালু আপনার কাছে কী?
এখানে সবকিছু পরিবর্তনশীল
- আজকের ইজ্জত কালকে বেইজ্জত হয়ে যায়
- আজকের ধনী কালকে গরিব হয়ে যায়
- আজকের হাসি-খুশি কালকে কান্না হয়ে যায়
- আজকের সুখ কালকে দুঃখ হয়ে যায়
ধনী হোক বা গরিব — সুখের পর দুঃখ আসবে, দুঃখের পর সুখ আসবে। গরিবের হয়তো খাবারের কষ্ট; ধনী টাকা কামিয়ে ফেলেছে, কিন্তু দুঃখকে জয় করে ফেলেনি — আল্লাহ তাকে দুঃখ পৌঁছাবেনই।
তকদিরে যা আছে, তা পৌঁছাবেই। টাকা-পয়সা-ক্ষমতা অর্জন করে কেউ দুঃখ-কষ্ট থেকে পার পেয়ে যায় না — অসম্ভব। তাহলে এই জীবনের পিছনে ছুটে আমাদের লাভ কী?
দুনিয়ার নিয়ামত — পেতে কষ্ট, পেয়ে গেলে ফিকে
| উদাহরণ | পরিণতি |
| যুবক কান্নাকাটি করে মোটরসাইকেল নেয় | কয়েকদিন পরে ফেলে রাখে |
| "মোবাইল থাকলে সারাদিন চালাতাম" | কয়েকদিন পরে বুক পকেটে-পিছ পকেটে খেয়ালই থাকে না |
| অনেক টাকা জমিয়ে নতুন বাড়ি | কয়েকদিন নতুন লাগে, পরে যেই-সেই |
| কক্সবাজারের সমুদ্র | প্রথম কয়েকদিন ভালো, এরপর আনন্দ থাকে না |
দুনিয়ার কষ্টও তেমনি শুকিয়ে যায় — কারো পা কেটে গেল, মনে হয় জীবন শেষ; দুইদিন পরে দেখবেন সে হাসছে।
কিন্তু আখেরাত ভিন্ন: জাহান্নামের আজাব সহ্যের মধ্যে আসবে না, আর জান্নাতের নিয়ামতে কোনো সময় বিরক্তি আসবে না।
এখানকার হায়াতও ধোঁকা, নিয়ামতও ধোঁকা, আজাবও ধোঁকা। এরপরেও আমরা এটা নিয়েই আশা করি — এই বাড়ি বুঝি সবসময় থাকবে, এই সন্তান বুঝি সবসময় আমার থাকবে।
কারণটা কী? — আমাদের ঈমান দুর্বল।
সমাধান — আখেরাতকে সামনে রাখা
"ওয়া আম্মা মান খাফা মাকামা রব্বিহি ওয়া নাহান নাফসা আনিল হাওয়া"সূরা নাযিআত ৪০
দুনিয়ার খায়েশাত থেকে সেই ব্যক্তি বিরত থাকতে পারে, যার অন্তর আখেরাতের চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। আমাদের সামনে যেন সবসময় আখেরাত থাকে, হাশরের ময়দানের দৃশ্য থাকে, মালিকের সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব দেওয়ার অনুভূতি থাকে — তাহলেই দুনিয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও লোভ থেকে বাঁচতে পারব।
আমরা তাঁকে দেখার যোগ্যতা রাখি না
একটা পিঁপড়া যদি বলে "আমি পুরো পৃথিবী দেখব" — সে তো ১.৫ সেন্টিমিটার সামনেই দেখতে পায় না, যদিও নিজের চেয়ে ৫০ গুণ ওজন বহন করে। সে কীভাবে দুনিয়া দেখবে? আমাদেরও সেই ক্ষমতা এখানে দেওয়া হয়নি — মালিকের কুদরত, মালিকের মেশিন দেখে মালিককে স্মরণ করতে হবে।
১৪
অধ্যায় ১৪
তৃতীয় বিষয়: মালিকের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা
কেন দরকার
মালিকের সাথে গোলামির চুক্তি করেছি। এখন যদি না মানি, ওনার দ্বীন না শিখি — একদিকে ওনার নাফরমানি করব, আরেকদিকে ওনার কাছে চাইব — তিনি কি সেগুলো গ্রহণ করবেন?
ধ্যান-খেয়ালের সাথে মানা
"ওয়া আকিমিস সালাতা লিযিকরি" — আল্লাহর ধ্যানের জন্য নামাজ আদায় করো।সূরা ত্বহা ১৪
নামাজে দাঁড়িয়ে মালিককে ধ্যান করতে হবে। হাদিসে কুদসিতে আছে — বান্দা নামাজে দাঁড়িয়ে যখন অন্য চিন্তা করে, আল্লাহ বলেন:
"হে বান্দা, আমার সামনে দাঁড়িয়ে কার কথা ভাবো? যার কথা ভাবো, সে কি আমার চেয়ে উত্তম? আমার চেয়ে সুন্দর? আমার চেয়ে ক্ষমতাশালী?"
মুসলমান বনাম মুমিন
"কালাতিল আ'রাবু আমান্না" — আরবরা বলল, আমরা ঈমান এনে ফেলেছি। না — কালেমা পড়ার দ্বারা মুসলমান হয়েছ; ঈমানদার হওয়ার জন্য শর্ত আছে।সূরা হুজুরাত ১৪
- মানুষ যখন কবিরা গুনাহ করে — সে ফাসেক মুসলমান।
- যখন কবিরা গুনাহ থেকে মুক্ত থাকে — সে মুমিন মুসলমান।
তাই দুটি জিনিস সবসময় ফরজ:
- গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা
- গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে তওবা করা
তাহলেই আমাদের ঈমান সুন্দর ও পরিপাটি থাকবে।
তবলীগের পরিভাষায় তিন সিফাত
এই তিনটি বিষয়কেই তবলীগে বলা হয় — কালেমা, নামাজ, এলেম-জিকির।
১৫
অধ্যায় ১৫
দ্বীন হেফাজতের তিনটি বিষয়
যে তিনটি বিষয়ের মাধ্যমে অর্জিত দ্বীন হেফাজত হবে:
১. বান্দার হক আদায় করা
মানুষের প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা।
২. আখলাক ও এখলাস
সুন্দর চরিত্র এবং নিয়তের একনিষ্ঠতা।
৩. দাওয়াত
মানুষকে দ্বীনের দিকে ডাকা।
দাওয়াতের অনিবার্যতা
"হয় মরো, নাইলে মারো" — এই হলো জামানা। হয় আপনি দ্বীনের দাওয়াত দেবেন, নাইলে দাওয়াত খাবেন। দুইটার একটা ঘটবেই।
- বর্তমান যুগে, আমি যে পরিবেশে চলি — মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত না দিলে মানুষ আমাকেই বদদ্বীন বানিয়ে ফেলবে।
- মানুষ পরিবেশে আছর হয়। নেককার বান্দাদের সাথে মিশতে হবে।
- আশেপাশের মানুষকে দ্বীনের দিকে না ডাকলে আল্লাহ আমার দ্বীনকেই পরিবর্তন করে দেবেন, গোমরাহ বানিয়ে দেবেন।
এই তিনটি বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা সামনের মজলিসে হবে বলে বক্তা জানিয়েছেন।
১৬
অধ্যায় ১৬
আল্লাহর মাইয়্যাত: তিনি সবসময় আমাদের সাথে
- আমরা পাঁচজন থাকলে ষষ্ঠজন তিনি — তিনি সবসময় আমার সাথে আছেন।
- সামনে কেউ থাকলে আমি তাকে দেখতে-শুনতে পাই, তাই বলি "সে আমার সামনে আছে"। এক-দুই কিলোমিটার দূরে বরাবর থাকলেও বলব না "আমার সাথে আছে"।
- কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি এমন — আমার কলিজার ভিতরের কাঁপুনিটাও তিনি শুনছেন।
তাহলে তিনি কতটা সাথে আছেন দেখুন — আমি নিজেও জানি না, এমনভাবে আমার ভিতরে পর্যন্ত আছেন।
একটি আদব: মানুষের সামনে মানুষের প্রশংসা করতে নেই — অহংকার চলে আসে। কিন্তু আল্লাহর সামনে আল্লাহর প্রশংসা করুন — তিনি তো সবসময় আমাদের সাথেই আছেন।
১৭
অধ্যায় ১৭
বাচ্চাদের ঈমানি তারবিয়াত
হাদিসে আছে — মানুষের বাচ্চা যখন কথা বলা শেখে, তাকে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" শিক্ষা দেওয়া। অর্থাৎ এক ইলাহ আল্লাহ ছাড়া কারো থেকে কিছু হয় না — এই শিক্ষাটা দিতে হবে।
মূর্তি কেন ইলাহ নয়
নবীরা বলতেন — "লা ইয়াদুররুনা ওয়ালা ইয়ানফাউন" — এরা ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। ইলাহ হতে হলে ক্ষতি করার যোগ্যতা লাগবে, নাহয় উপকার করার যোগ্যতা লাগবে।
কিছু মানুষ মূর্তিকে ভয়ে পূজা করে, কিছু মানুষ পাওয়ার আশায় পূজা করে। কিন্তু মূর্তি কোনো কিছুই পারে না — নবীরা দাবি করতেন, উপকার-ক্ষতি সবই আল্লাহ পারেন।
বাচ্চাকে দেখিয়ে দেখিয়ে শেখানো
- "এই যে বৃষ্টি হচ্ছে — আল্লাহ দিচ্ছেন।"
- "এই যে গাছ — এটা আল্লাহ চালাচ্ছেন।"
- গাছ তো তার অস্তিত্বেই ছিল না — সে ছিল বীজের মধ্যে, বীজ ছিল মাটির মধ্যে। মাটির মধ্যে ১০০টা বীজের ৯৯টাই মাটি খেয়ে ফেলেছে, একটা বেঁচে গেছে। সে নিজের কল্যাণে বাঁচেনি — কেউ তাকে বাঁচিয়েছে, তার দ্বারা কেউ কাজ নিচ্ছে।
- এভাবে বাচ্চাদের ঈমান শেখাতে শেখাতে নিজের ভিতরেও ঈমানি চর্চা হবে।
১৮
অধ্যায় ১৮ · সমাপনী
আজকের নিয়ত ও আমল
অন্তরে এক ইলাহ এলে যা হবে
অন্তরে এক ইলাহ এসে গেলে আপনার পেরেশানি সব শেষ। কেউ আপনাকে বদনাম করল কি করল না — কিছুই লাগবে না। দুনিয়াতে কী হলো না হলো — শেষে তো মউতই হবে। অন্তর স্থির হয়ে যাবে, অন্তরের মধ্যে সবর চলে আসবে।
আজ থেকে নিয়ত
- আমার অন্তরে একমাত্র এক ইলাহ রাখব — ১০০ ইলাহ রাখব না। এক ইলাহ থেকেই সমস্ত সুখ-দুঃখ আশা করব।
- যখনই ভিন্ন ভিন্ন জিনিস থেকে আশা আসবে, তখনই বলব — "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" — না, কারো দ্বারা কিছু হবে না, এক আল্লাহ দ্বারাই সবকিছু হবে।
- প্রত্যেকবার প্রতিটি প্রয়োজন আল্লাহর কাছে পেশ করব — রিজিক হোক বা যেকোনো ছোটখাটো আশা।
ঈমানি চর্চার পদ্ধতি
- পরস্পরে ঈমানি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা — এটাই ঈমান হাসিলের রাস্তা।
- Facebook-এর রিলস না চালিয়ে ১০-২০ জনের গ্রুপে ভিডিও কলে ঈমানি আলোচনা করা। সবার অন্তর স্থির থাকবে, আসল জীবন নিয়ে আলাপ করলে ভালো লাগবে।
- একে অপরকে সবক শোনানো — তাহলে সবার মুখ চালু হবে।
রবকে নিয়ে যদি বলতে না পারলাম, তাহলে এই মুখের কী ফায়দা? যদি এই চোখ দ্বারা রবকে দুনিয়াতে দেখতে না পারলাম?
শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ
অনেক মাদ্রাসায় নাহু-সরফ, গ্রামার শেখাতে শেখাতেই সময় চলে যায়। কেউ পড়ে এসে জান্নাত নিয়ে কথা বলতে পারে না — কারণ এগুলো তো শেখানো হয়নি। অথচ জান্নাত, জাহান্নাম, কবর — আখেরাতের এই বিষয়গুলো আম মানুষ সবাই শিখতে পারবে এবং বলতে পারবে। তাই অল্প অল্প টপিক করে শেখানো হবে এবং সবক নেওয়া হবে।
বক্তার নিজের পটভূমি
"আমি তাবলিগে ১৩ মাস লাগাতার সাল দিয়েছিলাম, প্রচুর চিল্লা দিয়েছিলাম। কোরআন নিয়ে গবেষণা করতে করতে, তাফসীর পড়ার পর কোরআনের মাধ্যমে মানুষকে দাওয়াত দিতাম। ঈমানের সব কথা কোরআন থেকে আসবে।"
সমাপনী দোয়া
"ওয়া মা আলাইনা ইল্লাল বালাগুল মুবীন"
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা,
আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক।
প্রতি শুক্রবার রাত ৯:৩০-এ লাইভ
সাপ্তাহিক ঈমানি প্রশিক্ষণ Facebook ও Zoom-এ সরাসরি হয় — ফ্রি উমরাহ লটারীর রেজিস্ট্রেশন খোলে প্রতি শুক্রবার রাত ৯টায়, আর রাত ৯:৩০-এর লাইভেই ড্র হয়।