কুরস তবাশির: ঐতিহ্যবাহী ইউনানি হাব — উপকারিতা, উপাদান ও সেবনবিধি
প্রাচীন ইউনানি ক্বারাবাদিন অনুসারে প্রস্তুত এই বটিকা শরীরের অতিরিক্ত উষ্ণতা প্রশমন ও হৃদ-স্নায়ুর প্রশান্তিতে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
কুরস তবাশির হলো ইউনানি চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি প্রাচীন ও পরিচিত কম্পাউন্ড ফর্মুলা, যা ছোট ছোট বটিকা বা কুরস (হাব) আকারে প্রস্তুত করা হয়। এর নামকরণ হয়েছে প্রধান উপাদান তবাশির থেকে, যা বাঁশের গিঁটের ভেতরে জমে থাকা একটি প্রাকৃতিক শ্বেত পদার্থ থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং প্রকৃতিতে শীতল (বারিদ) স্বভাবের বলে ইউনানি গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত। ঐতিহ্যবাহী ক্বারাবাদিন ও বায়াজ গ্রন্থ অনুসারে এই ফর্মুলায় তবাশিরের সাথে কহরুবা, গাওজবান, বেহমান সুরখ-সফেদ, তুখমে খুরফা ও শ্বেত চন্দনের মতো ঠান্ডা প্রকৃতির একাধিক উপাদান একত্রে মিশিয়ে বটিকা প্রস্তুত করা হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে এই ফর্মুলা শরীরের অতিরিক্ত উষ্ণতা প্রশমন, হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রকে প্রশান্তি দেওয়া এবং সাধারণ দুর্বলতায় সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। হাকীম মাওলানা আশরাফ আলী-র ঐতিহ্যবাহী ইউনানি অভিজ্ঞতার আলোকে প্রস্তুতকৃত এই ফর্মুলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিচের অংশগুলো পড়ুন।
প্রধান উপাদান
- তবাশির (বাঁশের কর্পূর) — প্রধান উপাদান; বাঁশের গিঁটে জমে থাকা প্রাকৃতিক শ্বেত পদার্থ, প্রকৃতিতে ঠান্ডা
- কহরুবা (অ্যাম্বার) — শীতল প্রকৃতির উপাদান, শরীরে প্রশান্তি আনতে ব্যবহৃত
- গাওজবান (Borage) — হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের প্রশান্তির জন্য প্রচলিত
- বেহমান সুরখ ও বেহমান সফেদ — শক্তিবর্ধক ও হৃদ-শক্তিদায়ক হিসেবে প্রচলিত
- তুখমে খুরফা (কুলফা বীজ) — ঠান্ডা প্রকৃতির, দেহের অতিরিক্ত তাপ প্রশমনে ব্যবহৃত
- সন্দল সুফেদ (শ্বেত চন্দন) — শীতলকারক ও সুগন্ধি উপাদান
- গুলে গাওজবান/গুলে নীলুফার — প্রশান্তিদায়ক পুষ্প-উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়
- মিছরি/চিনি (কিরিমান) — বটিকা বাঁধার সহায়ক ও স্বাদ ঠিক রাখার উপাদান
কোন কোন রোগে উপকারী
ইউনানি ক্বারাবাদিন গ্রন্থাদি অনুসারে কুরস তবাশির মূলত শরীরের অতিরিক্ত গরমি (হারারত) জনিত সমস্যায় ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর শীতল প্রকৃতির কারণে নিম্নলিখিত অবস্থায় এটি প্রচলিতভাবে সহায়ক বলে বিবেচিত হয়:
- শরীরে অস্বাভাবিক গরমি অনুভূতি ও অস্থিরতা
- হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা ও দ্রুত স্পন্দনজনিত অস্বস্তি (খাফকান)
- মানসিক অস্থিরতা, উদ্বেগ ও ঘুমের ব্যাঘাত
- অতিরিক্ত পিপাসা ও মুখ শুকিয়ে যাওয়া
- সাধারণ দুর্বলতা ও শক্তিহীনতা
ইউনানি দৃষ্টিকোণে ব্যাখ্যা
ইউনানি মতে দেহের চার মিজাজের (সাংগুইন, বাইলিয়াস, ফ্লেগমেটিক, মেলাংকলিক) মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। যখন দেহে সাফরাভি (উষ্ণ-শুষ্ক) মিজাজ প্রবল হয়ে ওঠে, তখন ঠান্ডা প্রকৃতির ওষুধ দিয়ে তা প্রশমিত করার প্রথা প্রচলিত, আর কুরস তবাশির এই শ্রেণিরই একটি স্বীকৃত ফর্মুলা। এটি কোনো নির্দিষ্ট রোগের সম্পূর্ণ নিরাময় নয় বরং সহায়ক হিসেবে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়।
কীভাবে কাজ করে
ইউনানি চিকিৎসাতত্ত্ব অনুসারে কুরস তবাশির-এর কার্যকারিতা এর উপাদানগুলোর সম্মিলিত শীতল ও প্রশান্তিদায়ক গুণের উপর নির্ভরশীল। তবাশির নিজে অত্যন্ত ঠান্ডা প্রকৃতির বলে বর্ণিত, যা দেহের অভ্যন্তরীণ উষ্ণতা প্রশমনে সহায়ক ভূমিকা রাখে বলে ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয়।
উপাদানভিত্তিক কার্যপ্রণালী
কহরুবা ও গাওজবানের মতো উপাদান হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রকে প্রশান্ত রাখতে সহায়ক বলে প্রাচীন গ্রন্থে উল্লেখ আছে। বেহমান সুরখ ও সফেদ হৃদ-শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক উপাদান হিসেবে পরিচিত, আর তুখমে খুরফা শরীরের অতিরিক্ত তাপ ও পিপাসা কমাতে ব্যবহৃত হয়। শ্বেত চন্দনের শীতলকারী গুণ সামগ্রিকভাবে ফর্মুলাটির প্রভাবকে সহায়তা করে।
এই উপাদানগুলো একত্রে মিশে বটিকা আকারে তৈরি হওয়ায় ধীরে ধীরে হজম ও শোষিত হয়ে দেহে কাজ করে বলে ইউনানি মতে বর্ণিত আছে। এটি কোনো তাৎক্ষণিক রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া নয় বরং দেহের সামগ্রিক ভারসাম্য পুনঃস্থাপনের একটি ধীর প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই ফলাফল পেতে ধৈর্য ধরে নিয়মিত সেবন প্রয়োজন।
সেবনবিধি ও মাত্রা
ঐতিহ্যবাহী ইউনানি প্রথা অনুসারে কুরস তবাশির সাধারণত নিম্নোক্তভাবে সেবন করা হয়, তবে ব্যক্তিভেদে মাত্রা ভিন্ন হতে পারে বিধায় হাকীমের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়:
- প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য: সাধারণত ১-২টি বটিকা দিনে ২ বার
- সেবনের সময়: সাধারণত খাবারের পর ঠান্ডা পানি বা দুধের সাথে
- সহযোগে সেবন: কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোলাপজল বা মিছরির শরবতের সাথে সেবনের প্রথা প্রচলিত
ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখুন
মাত্রা রোগীর বয়স, দৈহিক অবস্থা ও উপসর্গের তীব্রতার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নিজে থেকে মাত্রা বাড়ানো বা কমানো থেকে বিরত থাকা উচিত। প্রথমবার সেবনের আগে একজন অভিজ্ঞ হাকীমের সাথে পরামর্শ করে সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা। ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট সময় ধরে সেবন করলে ঐতিহ্যগতভাবে ভালো ফল পাওয়া যায় বলে জানা যায়, তবে এটি কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নয়।
সতর্কতা ও সংরক্ষণ
যেকোনো ঐতিহ্যবাহী ওষুধের মতো কুরস তবাশির ব্যবহারেও কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি:
- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে হাকীমের পরামর্শ ছাড়া সেবন না করা
- অতি ঠান্ডা প্রকৃতির (বারিদ মিজাজ) ব্যক্তিদের সতর্কতার সাথে ও পরামর্শক্রমে সেবন করা উচিত
- অন্য কোনো ওষুধ চলমান থাকলে চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করে নেওয়া ভালো
- শিশুদের ক্ষেত্রে মাত্রা অবশ্যই হাকীমের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারণ করা
- নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত সেবন থেকে বিরত থাকা
সংরক্ষণ পদ্ধতি
এই বটিকা শুষ্ক, ঠান্ডা ও আলো থেকে দূরে এমন স্থানে বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত। সরাসরি সূর্যালোক ও আর্দ্রতা থেকে দূরে রাখলে এর গুণগত মান দীর্ঘদিন বজায় থাকে। শিশুদের নাগালের বাইরে সংরক্ষণ করুন। মেয়াদোত্তীর্ণ হলে তা সেবন না করাই নিরাপদ। কোনো প্রকার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলে সাথে সাথে সেবন বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসা
কুরস তবাশির কী ধরনের ওষুধ?
কুরস তবাশির খেলে কি দ্রুত ফল পাওয়া যায়?
গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মা কি এটি খেতে পারবেন?
কুরস তবাশির কতদিন সেবন করা যায়?
শিশুদের কি কুরস তবাশির দেওয়া যায়?
কুরস তবাশির কোথায় থেকে সংগ্রহ করা যাবে ও পরামর্শ পাওয়া যাবে?
পরামর্শ নিন
কুরস তবাশির বা এ ধরনের ইউনানি ফর্মুলা সম্পর্কে জানতে ও সঠিক পণ্য বেছে নিতে এখনই কল করুন হটলাইন ০৯৬৬৬৭৯২৪৯২ নম্বরে।
হাকীম মাওলানা আশরাফ আলী