যষ্টিমধু (Glycyrrhiza glabra) — কাশি ও গ্যাস্ট্রিকের ঐতিহ্যবাহী ভেষজ
কাশি ও গ্যাস্ট্রিকে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত মিষ্টি-স্বাদের ভেষজ শিকড় যষ্টিমধু সম্পর্কে বিস্তারিত—উপকারিতা, সক্রিয় উপাদান, সঠিক মাত্রা ও সতর্কতা।
যষ্টিমধু (ইংরেজিতে Licorice বা Liquorice, ইউনানি পরিভাষায় "অসল-উস-সূস", হিন্দিতে "মুলেঠি") হলো হাজার বছরের পুরোনো একটি সুপরিচিত ভেষজ, যার মিষ্টি-স্বাদের শুকনো শিকড় ঐতিহ্যবাহী ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Glycyrrhiza glabra এবং এটি শিম (Fabaceae) পরিবারভুক্ত। গ্রিক শব্দ "glykys" (মিষ্টি) ও "rhiza" (শিকড়) থেকে এর নামকরণ, অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থে "মিষ্টি শিকড়"।
ঐতিহ্যগতভাবে যষ্টিমধু প্রধানত কাশি ও গ্যাস্ট্রিক সমস্যায় ব্যবহৃত হয়; পাশাপাশি গলা খুসখুস, বুকজ্বালা, অম্লতা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট পরিষ্কারেও এটি সহায়ক বলে বিবেচিত। আধুনিক গবেষণায় এর শিকড়ে গ্লিসাইরিজিন ও ফ্ল্যাভোনয়েড জাতীয় উপাদান শনাক্ত হয়েছে, যা এর প্রশমক (demulcent) ও প্রদাহনাশক গুণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মনে রাখা জরুরি—এটি কোনো রোগের নিশ্চিত নিরাময় নয়, বরং একটি সহায়ক ভেষজ।
ঔষধি গুণ ও উপকারিতা
- শুকনো ও কফযুক্ত কাশিতে গলা নরম রাখতে ঐতিহ্যগতভাবে সহায়ক
- গলা খুসখুস, স্বরভঙ্গ ও গলাব্যথায় প্রশমক (demulcent) হিসেবে ব্যবহৃত
- শ্বাসনালিতে জমে থাকা কফ তরল করে বের করতে (expectorant) সহায়ক
- গ্যাস্ট্রিক, বুকজ্বালা ও অম্লতায় পাকস্থলীর আবরণ রক্ষায় ঐতিহ্যগত ব্যবহার
- পেটের প্রদাহ ও আলসারজনিত অস্বস্তি কমাতে সহায়ক বলে বিবেচিত
- মৃদু কোমলকারক গুণে কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট পরিষ্কারে সহায়ক
- প্রাকৃতিক প্রদাহনাশক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানে সমৃদ্ধ
- মুখের ঘা ও গলার সংক্রমণে ঐতিহ্যগতভাবে গার্গল হিসেবে ব্যবহৃত
- সাধারণ দুর্বলতায় ইউনানি মুসলিহ/রসায়ন হিসেবে বিবেচিত
- তেতো ভেষজ মিশ্রণের স্বাদ সংশোধনে (corrective) ব্যবহৃত
যষ্টিমধু কী ও কোথায় পাওয়া যায়
যষ্টিমধু একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, যার মাটির নিচের শিকড় ও রাইজোম (মূলকাণ্ড) ঔষধি অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শিকড় শুকিয়ে টুকরো বা গুঁড়া (পাউডার) আকারে বাজারজাত করা হয়; স্বাদ স্বাভাবিকভাবেই মিষ্টি, যা চিনির চেয়ে বহুগুণ বেশি মিষ্টি অনুভূত হয়।
উদ্ভিদটি মূলত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, আফগানিস্তান, তুরস্ক, ভারত ও পাকিস্তানের শুষ্ক-উষ্ণ অঞ্চলে জন্মে। বাংলাদেশে এটি সাধারণত আমদানি করা শুকনো শিকড় বা গুঁড়া হিসেবে পাওয়া যায়।
বাজারে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত—যষ্টিমধু, মুলেঠি, অসল-উস-সূস, লিকোরিস। ভালো মানের যষ্টিমধু কেনার সময় দেখতে হয় শিকড় যেন হলদে-বাদামি, শুকনো, ছত্রাকমুক্ত ও স্বাভাবিক মিষ্টি-গন্ধযুক্ত হয়। ভেষজ দোকান, ইউনানি ফার্মেসি এবং হাকীম মাওলানা আশরাফ আলীর হার্বাল প্রতিষ্ঠান থেকেও নির্ভরযোগ্য যষ্টিমধু সংগ্রহ করা যায়।
কোন কোন রোগে ব্যবহৃত হয়
শ্বাসতন্ত্র ও কাশি
ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় যষ্টিমধুর সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহার কাশিতে। শুকনো কাশি, কফযুক্ত কাশি, গলা খুসখুস, স্বরভঙ্গ, ব্রংকাইটিস ও গলাব্যথায় এটি গলাকে আরাম দেয় এবং কফ তরল করে বের করতে সহায়ক বলে বিবেচিত। বহু ইউনানি শরবত (যেমন শরবত-এ-সদর) ও জোশান্দায় এটি অন্যতম উপাদান।
গ্যাস্ট্রিক ও পরিপাকতন্ত্র
যষ্টিমধু গ্যাস্ট্রিক, বুকজ্বালা, অম্লতা ও পাকস্থলীর প্রদাহে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত। এটি পাকস্থলীর আবরণে রক্ষাকারী শ্লেষ্মা বাড়িয়ে আলসারজনিত অস্বস্তি কমাতে সহায়ক বলে ধরা হয়। পাশাপাশি মৃদু কোমলকারক গুণের জন্য কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট পরিষ্কারেও এটি সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এছাড়া মুখের ঘা ও গলার সংক্রমণে গার্গল হিসেবে এবং সাধারণ দুর্বলতায় রসায়ন/মুসলিহ হিসেবেও এর ঐতিহ্যগত ব্যবহার আছে। উল্লেখ্য, এসব ব্যবহার মূলত ঐতিহ্যনির্ভর—কোনো রোগের গ্যারান্টিযুক্ত নিরাময় নয়।
সক্রিয় উপাদান ও কীভাবে কাজ করে
যষ্টিমধুর শিকড়ের প্রধান সক্রিয় উপাদান হলো গ্লিসাইরিজিন (glycyrrhizin / গ্লিসাইরিজিক অ্যাসিড)—একটি ট্রাইটারপিন স্যাপোনিন, যা এর মিষ্টি স্বাদের জন্যও দায়ী। এছাড়া রয়েছে গ্লিসাইরেটিনিক অ্যাসিড এবং লিকুইরিটিন, আইসোলিকুইরিটিন, লিকুইরিটিজেনিন প্রভৃতি ফ্ল্যাভোনয়েড, চ্যালকোন ও কুমারিন জাতীয় যৌগ।
কীভাবে কাজ করে
- প্রশমক (demulcent): মিউকাস আবরণে পাতলা প্রলেপ তৈরি করে গলা ও পাকস্থলীর জ্বালা-অস্বস্তি কমায়।
- কফনিঃসারক (expectorant): শ্বাসনালিতে শ্লেষ্মা নিঃসরণ বাড়িয়ে জমে থাকা কফ আলগা করে বের হতে সাহায্য করে।
- প্রদাহনাশক: গ্লিসাইরেটিনিক অ্যাসিড কর্টিকোস্টেরয়েডের মতো প্রদাহ-প্রশমক ক্রিয়া দেখায় বলে গবেষণায় ইঙ্গিত মেলে।
- পাকস্থলী-রক্ষাকারী: রক্ষাকারী শ্লেষ্মা বাড়িয়ে পাকস্থলীর ভেতরের আবরণকে সুরক্ষা দেয়।
উল্লেখ্য, গ্লিসাইরিজিন শরীরে 11β-HSD2 এনজাইমকে বাধা দেয়, যা অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যবহারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে (নিচে দেখুন)।
খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা
যষ্টিমধু খাওয়ার নিয়ম নির্ভর করে সমস্যা ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর। সাধারণ ঐতিহ্যগত মাত্রা নিচে দেওয়া হলো, তবে এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়:
- গুঁড়া (পাউডার): সাধারণত দিনে ১–৩ গ্রাম, কুসুম গরম পানি বা মধুর সঙ্গে।
- কাশির জন্য: সামান্য যষ্টিমধু গুঁড়া মধুর সঙ্গে মিশিয়ে, অথবা এক টুকরো শিকড় ধীরে ধীরে চুষে।
- ক্বাথ/চা: এক কাপ পানিতে অল্প শিকড় জ্বাল দিয়ে দিনে ১–২ বার।
- গার্গল: ক্বাথ কুসুম গরম অবস্থায় গলার আরামের জন্য কুলকুচি।
খাবারের পর বা খালি পেটে—দুইভাবেই ব্যবহারের প্রচলন আছে; গ্যাস্ট্রিকের ক্ষেত্রে খাবারের আগে ব্যবহার বেশি প্রচলিত। একটানা দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রায় না খেয়ে সাধারণত ২–৪ সপ্তাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নিরাপদ। সঠিক মাত্রা ও উপযুক্ত মিশ্রণ জানতে হাকীম মাওলানা আশরাফ আলীর হার্বাল হটলাইন ০৯৬৬৬৭৯২৪৯২-এ যোগাযোগ করতে পারেন।
সতর্কতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
যষ্টিমধু পরিমিত মাত্রায় ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপদ ধরা হলেও অতিরিক্ত বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার কিছু সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর গ্লিসাইরিজিন উপাদান বেশি মাত্রায় শরীরে সোডিয়াম ধরে রাখে ও পটাশিয়াম কমায়, যা "সিউডোঅ্যালডোস্টেরনিজম" নামে পরিচিত।
সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া:
- উচ্চ রক্তচাপ (ব্লাড প্রেশার বেড়ে যাওয়া)
- রক্তে পটাশিয়াম কমে যাওয়া, দুর্বলতা ও মাংসপেশির টান
- শরীরে পানি জমা এবং হাত-পা ফুলে যাওয়া (edema)
যাঁদের সাবধানতা বা এড়িয়ে চলা উচিত: উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি বা লিভারের রোগী; গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা; এবং যাঁরা ডায়ুরেটিক, ডিগোক্সিন বা রক্তচাপের ওষুধ সেবন করেন। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়। শিশুদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন।
দ্রষ্টব্য: এই তথ্য কেবল সচেতনতার জন্য; এটি কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা বা নিরাময়ের দাবি নয়। জটিল বা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় অবশ্যই যোগ্য হাকীম বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসা
যষ্টিমধু এর উপকারিতা কী কী?
যষ্টিমধু খাওয়ার নিয়ম কী?
যষ্টিমধু কি গ্যাস্ট্রিকে কাজ করে?
যষ্টিমধু কতদিন খাওয়া নিরাপদ?
গর্ভাবস্থায় যষ্টিমধু খাওয়া যাবে কি?
যষ্টিমধু কি কোষ্ঠকাঠিন্যে সাহায্য করে?
পরামর্শ নিন
যষ্টিমধু বা যেকোনো ভেষজ চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে ও সঠিক পণ্য বেছে নিতে এখনই কল করুন হটলাইন ০৯৬৬৬৭৯২৪৯২ নম্বরে।
হাকীম মাওলানা আশরাফ আলী