মাড়ির রোগ ও পাইরিয়ার প্রাকৃতিক যত্ন — দাঁত মজবুত রাখার উপায়
ব্রাশ করতে গিয়ে মাড়ি থেকে রক্ত বের হওয়া, মাড়ি ফুলে লাল হয়ে থাকা, দাঁতের গোড়ায় ব্যথা কিংবা মুখে সবসময় একটা দুর্গন্ধ ভাব — এসব উপসর্গকে আমরা প্রায়ই সাধারণ ভেবে এড়িয়ে যাই। অথচ এটাই হতে পারে পাইরিয়ার শুরু, যা ধীরে ধীরে দাঁতের গোড়ার হাড় দুর্বল করে দিতে পারে। মাড়ি হলো দাঁতের ভিত্তি; ভিত্তি দুর্বল হলে দাঁত যতই সুন্দর হোক না কেন, তা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
সুখবর হলো, শুরুতেই সচেতন হলে এবং সঠিক যত্ন নিলে মাড়ির অনেক সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। নিয়মিত সঠিক নিয়মে ব্রাশ করা, মুখগহ্বর পরিষ্কার রাখা এবং শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার মাধ্যমে মাড়ির প্রদাহ ও রক্তপাত অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। এই পাতায় আমরা পাইরিয়া ও মাড়ির রোগের কারণ, লক্ষণ এবং ঘরোয়া ও সহায়ক যত্ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। প্রয়োজনে পরামর্শের জন্য কল করুন হটলাইন ০৯৬৬৬৭৯২৪৯২ নম্বরে।
পাইরিয়া আসলে কী?
পাইরিয়া হলো মাড়ি ও দাঁতের চারপাশের হাড়ের একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অবস্থা, যা দাঁতে জমে থাকা খাদ্যকণা ও জীবাণুর আস্তরণ (প্লাক) থেকে শুরু হয়। প্রথমে মাড়ি ফুলে লাল হয় ও সহজে রক্ত পড়ে, একে বলা হয় জিঞ্জিভাইটিস। সময়মতো যত্ন না নিলে এই প্রদাহ ধীরে ধীরে দাঁতের গোড়ার হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়, মাড়ি দাঁত থেকে সরে যেতে থাকে এবং দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একেই বলে পাইরিয়া বা পেরিওডন্টাইটিস।
লক্ষণ ও উপসর্গ
মাড়ির রোগ ও পাইরিয়ার সাধারণ লক্ষণগুলো নিচে দেওয়া হলো।
- ব্রাশ করার সময় বা এমনিতেই মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া
- মাড়ি ফুলে লাল ও স্পর্শকাতর হয়ে থাকা
- মুখে সবসময় দুর্গন্ধ থাকা
- দাঁতের গোড়ায় হালকা ব্যথা বা শিরশির অনুভূতি
- মাড়ি ধীরে ধীরে নিচে নেমে দাঁতের গোড়া বেরিয়ে যাওয়া
- দাঁত নড়া বা আলগা মনে হওয়া
- মাড়িতে পুঁজ জমা বা চাপ দিলে পুঁজ বের হওয়া
- ঠান্ডা-গরম খাবারে দাঁতে সংবেদনশীলতা
কারণ
মাড়ির রোগ ও পাইরিয়ার পেছনে সাধারণত যেসব কারণ কাজ করে।
- নিয়মিত ও সঠিক নিয়মে ব্রাশ না করা
- দাঁতে দীর্ঘদিন জমে থাকা প্লাক ও পাথর (টার্টার)
- অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার
- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার
- দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও অপুষ্টি
- ভিটামিন সি ও অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি
- দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকা
- দাঁত আঁকাবাঁকা থাকায় পরিষ্কার করতে অসুবিধা
অবহেলা করলে যা হতে পারে
অনেকেই মাড়ি থেকে সামান্য রক্ত পড়াকে পাত্তা দেন না, ভাবেন এটি এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা করলে প্রদাহ ধীরে ধীরে দাঁতের গোড়ার হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এতে মাড়ি দাঁত থেকে সরে গিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, সেখানে খাবার আটকে আরও সংক্রমণ বাড়ে। একসময় দাঁতের গোড়ার হাড় ক্ষয় হয়ে দাঁত নড়তে শুরু করে এবং চিকিৎসা না নিলে দাঁত পড়েও যেতে পারে। এছাড়া মুখে স্থায়ী দুর্গন্ধ, খাবার চিবাতে অসুবিধা ও আত্মবিশ্বাসে ঘাটতির মতো সমস্যাও দেখা দেয়। তাই শুরুতেই মাড়ির প্রতি যত্নশীল হওয়া জরুরি।
ঘরোয়া যত্ন ও অভ্যাসের পরামর্শ
মাড়ি সুস্থ রাখতে দৈনন্দিন কিছু সহজ অভ্যাস অনেক সাহায্য করে।
ব্রাশ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
দিনে দুইবার নরম ব্রাশ দিয়ে সঠিক নিয়মে দাঁত ব্রাশ করুন। মাড়ির লাইন বরাবর হালকা চাপে ব্রাশ করা জরুরি, খুব জোরে ঘষলে মাড়ি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সম্ভব হলে প্রতিদিন ফ্লস ব্যবহার করে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যকণা পরিষ্কার করুন।
কুসুম গরম লবণ পানি
কুসুম গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে দিনে দুই-তিনবার কুলি করলে মাড়ির ফোলাভাব ও জীবাণু কমাতে সহায়ক হতে পারে। এটি একটি প্রচলিত ও সহজ ঘরোয়া অভ্যাস।
খাদ্যাভ্যাস ও অন্যান্য
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল (লেবু, আমলকী, পেয়ারা) নিয়মিত খান, এটি মাড়ির স্বাস্থ্যে সহায়ক বলে পরিচিত। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার ও ধূমপান পরিহার করুন এবং প্রতি ছয় মাসে একবার দন্ত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে দাঁত পরীক্ষা ও প্রয়োজনে স্কেলিং করিয়ে নিন।
কেন ভেষজ ও ইউনানি যত্ন সহায়ক হতে পারে?
ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতিতে মুখগহ্বর ও মাড়ির যত্নে বিভিন্ন ভেষজ উপাদানের ব্যবহারের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তবে মাড়ির রোগ মূলত মুখগহ্বরের স্থানীয় প্রদাহ ও জীবাণু সংক্রমণজনিত সমস্যা, তাই এর প্রধান সমাধান হলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্রয়োজনে দন্ত চিকিৎসকের স্কেলিং। এর পাশাপাশি শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে মাড়ির প্রদাহ প্রতিরোধেও তা পরোক্ষভাবে সহায়ক হতে পারে বলে ঐতিহ্যগতভাবে মনে করা হয়।
যাদের হজমশক্তি দুর্বল ও শরীরে পুষ্টির শোষণ ঠিকমতো হয় না, তাদের ক্ষেত্রে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। এক্ষেত্রে হজম ও লিভারের যত্নে তৈরি ভেষজ সিরাপ সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সহায়ক যত্নে ব্যবহার করা যেতে পারে — এটি সরাসরি পাইরিয়া সারানোর ওষুধ নয়, বরং শরীরের সার্বিক ভারসাম্য বজায় রাখার একটি সহায়ক অভ্যাস হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
মনে রাখা জরুরি, পাইরিয়ার মূল চিকিৎসা দন্ত চিকিৎসকের হাতেই। দাঁত নড়া শুরু করলে, মাড়িতে পুঁজ জমলে বা তীব্র ব্যথা হলে দেরি না করে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সাধারণ পরামর্শের জন্য আমাদের হটলাইন ০৯৬৬৬৭৯২৪৯২ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।
শিশু ও প্রবীণদের মাড়ির যত্নে বাড়তি খেয়াল
শিশুদের দুধ দাঁত ওঠার সময় থেকেই মাড়ির যত্নের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। ছোট থেকেই নরম ব্রাশে সঠিক নিয়মে দাঁত মাজা শেখালে বড় হয়ে মাড়ির রোগ হওয়ার প্রবণতা কমে। অন্যদিকে বয়স বাড়ার সাথে সাথে মাড়ি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা দুর্বল হতে থাকে, তাই প্রবীণদের ক্ষেত্রে নিয়মিত দাঁতের পরীক্ষা ও মাড়ির যত্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গর্ভাবস্থায়ও হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মাড়ি সংবেদনশীল হয়ে ফুলে যেতে পারে, একে বলা হয় গর্ভকালীন জিঞ্জিভাইটিস। এই সময় বাড়তি সতর্কতার সাথে মাড়ির যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডায়াবেটিস রোগীদেরও মাড়ির সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে বলে তাদেরও নিয়মিত মুখগহ্বরের যত্ন নেওয়া জরুরি।
প্রস্তাবিত পণ্য
মাড়ির জন্য সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো ভেষজ পণ্য না থাকলেও, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সহায়ক যত্নে নিচের পণ্যগুলো বিবেচনা করতে পারেন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসা
পাইরিয়া হলে কি দাঁত পড়ে যায়?
মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া কি বিপজ্জনক?
ভেষজ যত্নে কি পাইরিয়া সম্পূর্ণ সেরে যাবে?
পাইরিয়ার জন্য কোন পণ্য উপযুক্ত?
মুখে দুর্গন্ধ কমাতে কী করব?
দন্ত চিকিৎসকের কাছে কখন যাওয়া জরুরি?
আজই শুরু করুন
মাড়ির যত্ন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ পেতে এখনই কল করুন হটলাইন ০৯৬৬৬৭৯২৪৯২ নম্বরে।
হাকীম মাওলানা আশরাফ আলী